Logo
শিরোনাম :
নোটিশ :

আমাদের ভুবনে আপনাকে স্বগতম>>তথ্য নির্ভর সংবাদ পেতে  সাথে থাকুন  ধন্যবাদ।

ইউপি সদস্য নির্বাচিত হয়েই ফুলে ফেঁপে উঠেন নুরুল আবছার

বিশেষ প্রতিনিধি, / ২৬৪ বার
আপডেট সময় : শনিবার, ১৮ জুলাই, ২০২০

২০১৩ সালের দিকেও উখিয়ার জালিয়াপালং ইউনিয়নের নিদানিয়ায় ‘সী কিং’ হ্যাচারিতে সামান্য বেতনে চাকরি করতেন। এরপর চাকরি ছেড়ে অপরাধ জগতে ধীরে ধীরে পা বাড়ান। কালো টাকা বিলিয়ে ২০১৬ সালে ইউপি সদস্য নির্বাচিত হন।

ইউপি সদস্য পদকে ব্যবহার করে মাত্র চার বছরেই ফুলে ফেঁপে উঠেন নুরুল আবছার চৌধুরী। এর নেপথ্যে রয়েছে রোহিঙ্গাদের সহযোগিতায় বাংলাদেশ-মিয়ানমারে ইয়াবা ও স্বর্ণচোরাচালের বিশাল সিন্ডিকেট।

কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার পালংখালী ইউনিয়নের ১নং ওয়ার্ডের (বালুখালী) ইউপি সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে নুরুল আবছারের অর্থের উৎস নিয়ে কান কথা শুরু হয়। ধীরে ধীরে প্রকাশ পেতে থাকে তার মাদক কারবারের বিষয়টি। কিন্তু সরকার দলীয় রাজনৈতিক নেতা থেকে শুরু করে রন্দ্রে রন্দ্রে আবছারের ইয়াবা সিন্ডিকেটের সদস্য থাকায় সব সময় ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে নির্বিঘ্নে চালিয়ে আসছেন ইয়াবা ব্যবসা।

তবে ২০১৭ সালে যখন বাংলাদেশে রোহিঙ্গা ঢল নামে সেই ঢলে কপাল খুলে আবছারের। প্রসার বাড়ে ইয়াবা পাচারের। আগে বাংলাদেশে সীমাবন্ধ থাকলেও রোহিঙ্গা আসার পর মিয়ানমারেও তার চোরাচালান চক্র গড়ে উঠে।

ইউপি সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর সরকার দলীয় রাজনীতিতেও নিজের বেশ শক্ত অবস্থান গড়ে তুলেন তিনি। ভাগিয়ে নেন উখিয়া উপজেলা যুবলীগের যুগ্ম সম্পাদকের পদটি। টাকা উড়িয়ে হয়ে যান বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশন উখিয়া উপজেলার শাখার সভাপতি। নিজেকে পালংখালী ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যানও দাবী করতেন। সব ক্ষমতাই ব্যবহার করতেন ইয়াবা কারবারের জন্য।

আবছারের ইয়াবা ব্যবসা ও অবৈধ উপার্জন নিয়ে দীর্ঘ অনুসন্ধানে বের হয়ে আসে।

অনুসন্ধানে উঠে আসে রাতারাতি কোটি কোটি টাকার মালিক বনে যাওয়ার পিলে চমকানো তথ্য। অনুসন্ধানে তার ইয়াবা পাচার ও কালো টাকা আয়ের অনেক ডকুমেন্ট পাওয়া গেছে।

২০১৬ সালের ১৮ জুন পালংখালী ইউনিয়নের ১নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য পদে নির্বাচন করার জন্য নুরুল আবছার বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের কাছে হলফনামা জমা দেন। ওই হলফনামা কয়েকমাস আগে সংগ্রহ করা হয়।  সেখানে ব্যাংকে থাকা অর্থের পরিমাণের ‘স্থলে’ বেশ ঘষামাজা করে নির্বাচনের পর যে সংখ্যা পরিবর্তন করেছেন তা স্পষ্ট। তবুও ২০১৬ সালে হলফনামায় যে অর্থ উল্লেখ করেছিলেন সেটি মাত্র চার বছরে বহুগুণ ছাড়িয়ে গেছে। অথচ দৃশ্যমান কোন ব্যবসা উল্লেখ ছিল না হলফনামায়।

নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া হলফনামায় নুরুল আবছার উল্লেখ করেন ,নগদ টাকা হিসেবে তার রয়েছে মাত্র ১৫ হাজার টাকা। আর ব্যাংকে জমা রয়েছে ৯ লাখ ৩৫ হাজার টাকা।

৯,৩৫০০০ টাকা লেখার ক্ষেত্রে ‘৯’ এর জায়গায় বেশ কৌশলে ঘষামাজা করে সংখ্যা পরিবর্তন করেছেন। স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে সংশ্লিষ্টদের যোগসাজসে ‘১’ সংখ্যাটাকে ‘৯’ বানানো হয়েছে। কিন্তু তাও বর্তমান অর্থের পরিমাণের সাথে সেটির বহুগুণ পার্থক্য।

হলফনামায় তিনি আয়ের খাত এবং সেখান থেকে আয় হিসেবে দেখিয়েছেন, তার কৃষি জমি রয়েছে ২ কানি। কৃষি খাত থেকে তার আয় মাত্র ৩০ হাজার টাকা। ব্যবসা থেকে তার আয় ১ লাখ ১০ হাজার টাকা। কিন্তু কি ব্যবসা সেটি উল্লেখ করা হয়নি।

বাড়ি, গাড়ি সহ অন্যান্য কোন কিছুই উল্লেখ করা হয়নি সেই সময় জমা দেওয়া হলফনামায়।

২০১৬ সালের জুন থেকে ২০২০ সালের জুন পর্যন্ত মাত্র অল্প সময়ে অনেকবেশি পরিবর্তন এসেছে আবছারের অর্থ-সম্পদে। বিশেষ করে রোহিঙ্গা আসার পর থেকে অর্থ-সম্পদের জোয়ার শুরু হয়।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, হলফনামায় বাড়ি উল্লেখ না থাকলেও বর্তমানে আবছার দুটি তিন তলা বিশিষ্ট ভবন এবং ১টি টিনশেডের বিশাল কলোনী রয়েছে। এই তিনটি বাড়িই একই বাউন্ডারীর ভেতর এবং নির্বাচনের পরই বাড়িগুলো নির্মাণ করেছেন।

স্থানীয় এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দেয়া তথ্যমতে, এই তিনটি বাড়িই ইয়াবা ব্যবসার কেন্দ্রবিন্দু। এছাড়া তিনি রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ভেতরের বলীবাজারেও ইয়াবা ও স্বর্ণের গোডাউন গড়ে তুলেছেন।

ইউপি সদস্য নুরুল আবছার চৌধুরী ২টি ভবন এবং ১টি টিনশেড কলোনীর এই তিনটি বাড়ি গড়ে তুলেছেন বালুখালীতে নাফনদীর সীমানা ঘেঁষে। এই তিনটি বাড়ির বাউন্ডারীর মধ্যে প্রধান গেইট পশ্চিম দিকে। আর নাফনদীর দিকে আরেকটি গেইট করেছেন। যেটি সব সময় খোলা থাকে না।

সূত্রমতে, নাফনদীর অংশের গেইট দিয়েই নাফনদী থেকে ইয়াবার চালান তুলেন নুরুল আবছার সিন্ডিকেট। এরপর সেই ইয়াবা পাচারের জন্য চলে যায় রোহিঙ্গা শিবিরের বলীবাজারে এবং ট্রাকের চালকের মাধ্যমে চট্টগ্রামে। এজন্য জোগানে জোগানে মানুষ ঠিক করে রাখা আছে আবছারের।
চট্টগ্রামের একটি ট্রান্সপোর্ট অফিসে সামান্য বেতনে চাকরি করেন নুরুল আবছারের অন্যতম সহযোগী লুৎফুর রহমান। তার বিরুদ্ধে রামু থানায় একটি ইয়াবা মামলা রয়েছে। ট্রান্সপোর্টে চাকরি করে আয় করা মূল উদ্দেশ্য নয়, তার প্রধান কাজ ইয়াবা পাচার নিয়ন্ত্রণ।

সম্পদ অনুসন্ধান করে জানা গেছে, রোহিঙ্গা শিবির থেকে চালান সংগ্রহ ও সরবরাহ দেওয়ার জন্য ক্যাম্পের বলীবাজারে ৪০টিরও বেশি দোকান আবছারের নিয়ন্ত্রণে। ওই সব দোকানে সারাদিন কোনকিছু বিক্রি না হলেও যারা দোকান করেন তারা অঢেল টাকার মালিক। এই দোকানগুলো থেকে ইয়াবা ও স্বর্ণ পাচারের বিষয়টি গোয়েন্দা সংস্থার নজরেও আছে।

বালুখালীতে প্রতিষ্ঠিত ‘ক্যাফে হাইওয়ে’ রেস্তোরাঁর অন্যতম অংশীদার নুরুল আবছার। ক্যাম্পের বলীবাজারে আবছারের ইয়াবা সিন্ডিকেটের অন্যতম পার্টনার রোহিঙ্গা গ্রাম ডাক্তার ওসমানের সাথে অংশীদারে একটি বিশাল ফার্মেসী রয়েছে। ওই ফার্মেসী ইয়াবা ও স্বর্ণ চোরাচালানের অন্যতম কার্যালয়।

বালুখালী পানবাজারে আবছারের বিশাল মুদির দোকান রয়েছে। সেখানে বেশ কয়েকটি পণ্যের ডিলারশীপ নিয়েছেন তিনি।
এক সময় কোন গাড়ি না থাকলেও বর্তমানে তিনি ১ টি নোয়া (নোহা), ১ টি ডাম্পার ও ১টি ট্রাকসহ বেশকিছু গাড়ির মালিক। তার বড় ট্রাকটি চলাচল করে কক্সবাজার-চট্টগ্রাম-ঢাকা মহাসড়কে। এটি ইয়াবা বহনের অন্যতম বাহন।

হলফনামায় মাত্র ২ কানি জমি উল্লেখ করলেও মাত্র চার বছরে নুরুল আবছার বিপুল জমির মালিক। তার নামীয় ছাড়াও কৌশলে বিভিন্ন জনের নামে প্রচুর জমি কিনেছেন।

বালুখালী পূর্বপাড়ায় নাহার কবিরের কাছ থেকে বেশকিছু জমি কিনেছেন তিনি। নুরুল আবছারের অন্যতম ইয়াবা পার্টনার (সম্প্রতি একসাথে ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার) নুরুল আলমের কাছ থেকেও জমি ক্রয় করেছেন। ক্যাফে হাইওয়ে রেস্তোরাঁর পাশে বেশকিছু জমি কিনেছেন তিনি। বালুখালী পশ্চিমপাড়ায় তার জমির উপর হাসপাতাল করেছে ‘এমএসএফ’।

আবছারের সিন্ডিকেটের কয়েকজন সদস্য এবং স্থানীয় একটি সূত্রে জানা গেছে, ২০১৬ সালের শুরুর দিকে পালংখালীর শীর্ষ একজন ইয়াবা গডফাদারের ইয়াবার একটি চালান লুট করেন নুরুল আবছার। সেই ইয়াবা লুটে একসঙ্গে তিনি প্রায় ৭০ লাখ টাকার মালিক বনে যান। সেই কালো টাকা ঢেলে ২০১৬ সালের জুনে ইউপি সদস্য পদে জয় লাভ করেন তিনি। ইউপি সদস্য নির্বাচিত হয়েই ইয়াবা জগতে ধীরে ধীরে ডনে পরিণত হন।

জানা গেছে, নুরুল আবছার চৌধুরী সিন্ডিকেটের সদস্যদের অনেকে ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আছেন এবং অনেকে কারাগার থেকে জামিনে বের হয়ে আবারও ইয়াবা ব্যবসায় জড়িয়ে গেছেন। এরমধ্যে অন্যতম নুরুল আমিন। তিনি বর্তমানেও ইয়াবা মামলায় কারাগারে আছেন।

আরেক সদস্য ও তার খালাতো ভাই মনু সম্প্রতি ইয়াবা মামলায় চট্টগ্রাম কারাগার থেকে জামিনে বের হয়েছেন। আবছারের আপন ভাগিনা মোহিত আলম এক বছর আগে ইয়াবা মামলায় গাজীপুর কারাগার থেকে বের হয়

তার আরেক সদস্য লুৎফুর রহমান ইয়াবাসহ রামু থানায় গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। লুৎফুর রহমানের বাবা রহম আলীও আবছার সিন্ডিকেটের সদস্য। তার বিরুদ্ধে দুটি ইয়াবা মামলা আছে।

আবছারের অন্যতম সহযোগী ডাকাত নুরুল হক। তার বিরুদ্ধে ডজনাধিক মামলা আছে। আরেক সহযোগী হলেন আশিক। তিনিও ইয়াবা মামলার আসামী। রোহিঙ্গাদের মধ্যে অন্যতম সহযোগী হলেন কবির আহমেদ প্রকাশ কবির মাঝি, লালু মাঝি, চিকুইন্না, জামাল, রোহিঙ্গা গ্রাম ডাক্তার ওসমান প্রমুখ।

আবছারের বর্তমান ইয়াবা সিন্ডিকেটের হাল ধরেছে আলমগীর নিসা। আলমগীর নিসার আত্মীয় স্বজনের মধ্যেও বেশ কয়েকজন ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হয়েছেন।

উল্লেখ্য, দীর্ঘদিন বেপরোয়াভাবে ইয়াবা কারবার চালিয়ে আসলেও গত ১৩ জুলাই রাতে নিজ বাড়ির সামনে ইয়াবা লেনদেনের সময় ইয়াবা ডন নুরুল আবছার চৌধুরীকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। এসময় তার আরেক পার্টনার কমিউনিটি পুলিশ ও কৃষকলীগের নেতা আমিন চৌধুরীকেও গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে ১০ হাজার পিস ইয়াবা।

অভিযানে একটি অলিখিত চেক ও একটি স্বাক্ষরকৃত ছয়লক্ষ টাকার ব্যাংক চেক, ৩ টি এটিএম কার্ড, স্বাক্ষরকৃত ২ টি অলিখিত স্ট্যাম্প উদ্ধার করা হয় বলে জানিয়েছেন র‌্যাব-১৫ এর সহকারী পরিচালক (মিডিয়া) আবদুল্লাহ মোহাম্মদ শেখ সাদী।

র‌্যাব-১৫ এর সহকারী পরিচালক (মিডিয়া) আবদুল্লাহ মোহাম্মদ শেখ সাদী বলেন, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে র‌্যাব জানতে পারে যে, কতিপয় মাদক ব্যবসায়ী বালখালী পূর্বপাড়া এলাকার নুরুল আবছার চৌধুরীর বসতঘরের সামনে ইয়াবা ট্যাবলেট বিক্রয়ের উদ্দেশ্যে অবস্থান করছে।

নুরুল আবছার চৌধুরীর স্বীকারোক্তির বরাত দিয়ে তিনি আরও বলেন, দীর্ঘদিন ধরে মাদকদ্রব্য ইয়াবা ট্যাবলেট কক্সবাজার জেলার টেকনাফ ও উখিয়া সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে সংগ্রহ করে কক্সবাজারসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় পাচার করে আসছে তারা। তাদের একটি বিশাল সিন্ডিকেটও রয়েছে।

নুরুল আবছার চৌধুরী ও নুরুল আলমকে রিমান্ডে এনে তাদের সিন্ডিকেটের রাঘববোয়ালদের বের করার দাবী তুলেছেন সচেতন মহল।

সুত্র : ভয়েস ওয়ার্ল্ড -২৪


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর