Logo
নোটিশ :

আমাদের ভুবনে আপনাকে স্বগতম>>তথ্য নির্ভর সংবাদ পেতে  সাথে থাকুন  ধন্যবাদ।

শিক্ষা ব্যাবস্থায় কোভিড-১৯ এর প্রভাব ও সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ

আবদুল মালেক / ৪৬৯ বার
আপডেট সময় : রবিবার, ২৮ জুন, ২০২০

 

দেশের শিক্ষা ব্যাবস্থা সঠিক পথেই এগিয়ে যাচ্ছিল। শিক্ষা প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিদের সুনিপুণ পরিচালনায় শিক্ষা তার কক্ষপথেই ছিল। কিন্তু চীনের উহানে জন্ম নেয়া করোনা ভাইরাস শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ায় ছন্দ পতন ঘটাল। করোনা ভাইরাসে সৃষ্ট রোগ কভিড-১৯ এ আক্রান্ত হয়ে মানুষ দিশেহারা হয়ে পড়ল।পুরো দেশ যদি একটি ট্রেন হয় তাহল শিক্ষা ব্যাবস্থা একটি বগি। করোনার প্রভাবে এই বগিটি লাইনচ্যুত হলো। দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হতে লাগলো লাশের মিছিল। তারই প্রেক্ষিতে মার্চের মাঝামাঝি সরকার দেশ ব্যাপি লকডাউনের সিদ্ধান্ত নিল, যা আজ অব্দি চলমান। লক ডাউনের ফলে ছাত্রছাত্রীদের লেখাপড়ায় আপাত ছেদ পড়ল। হতে পারে অনেক শিক্ষার্থীর দীর্ঘ পথ পরিক্রমার পরিসমাপ্তি ঘটল।
বিজ্ঞানী নিউটন যথার্থই প্রমাণ করে গেছেন, “”প্রত্যেক ক্রিয়ারই সমান ও বিপরীত মুখী প্রতিক্রিয়া আছে””। করোনা মহামারী নিউটনের তৃতীয় সূত্র প্রমাণে মরিয়া। কোভিড-১৯ প্রমাণ করে দিল তার বিপরীত মুখী প্রতিক্রিয়া। করোনার মহাপ্লাবনে ঢুবে গেল সাজানো ঘোচানো একটি বাড়ি ( শিক্ষাব্যাবস্থা)। কোভিড-১৯ নামক ঘূর্ণিঝড়ের মহা তাণ্ডবে ওলট পালট হয়ে গেল শিশুদের মন। জমে গেল মরিচা। যেখান থেকে উত্তরনই আমাদের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ।এই সময়টাতে শিক্ষার্থীদেরকে সঠিত ট্র্যাককে রাখতে সরকার নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণ করে। কিন্তু উখিয়ার মতো পিছিয়ে পড়া এলাকায় এই উদ্যোগ আলোর মুখ দেখেনি। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর সংসদ বাংলা টিভির মাধ্যমে শ্রেণি কার্যক্রম চালানোর মতো সাহসী এবং সময়োপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ করে। উখিয়ার মতো পিছিয়ে পড়া এলাকায় এর সুফল পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১৫% এর অধিক হবেনা। শিক্ষার্থীদের বিশাল একটি অংশ এই সুবিধা থেকে বঞ্চিত হওয়ার পেছনে কিছু কারণ রয়েছে। যেমন–
* প্রত্যেকের বাড়িতে টেলিভিশন নেই।
* আবার টেলিভিশন আছে কিন্তু শ্রেণি কার্যক্রম চলাকালীন বিদ্যুৎ নেই। এই এলাকায় লোডশেডিং মারাত্মক।
* অধিকাংশ পরিবার সন্তানকে বাসায় পড়ালেখার পরিবেশ দিতে পারেনা।
* কিছু শিক্ষার্থীর ভার্চুয়াল ক্লাসে অনীহা।
* কিছু অভিভাবক মনে করে স্কুল বন্ধ মানে পড়ালেখাও বন্ধ। বিদ্যালয় খোললে পড়ালেখা করা যাবে।
* অনেক শিক্ষার্থী টেলিভিশনে ক্লাস চলাকালীন সময়ে লক ডাউনের মধ্যই কাজের সন্ধানে বেরিয়ে পড়ে।

টেলিভিশন ছাড়াও বিভিন্ন স্কুল অনলাইন পাঠদানের ব্যবস্থা করেছে। এই ব্যাবস্থা মূলতঃ শহর কেন্দ্রীক। গ্রামের শিক্ষার্থীদের মধ্যে বড়জোর ২/৩% এর আওতায় থাকবে। এই উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিক্ষার্থী অনলাইন শিক্ষা থেকে যেমন বঞ্চিত বা অনীহা তেমনি তাদের মধ্যে বেশিরভাগই গরিব, নিম্ন আয়ের লোক। যারা বাস করে গ্রামে কিংবা শহরের বস্তিতে। আবার অনেক শিক্ষার্থীর হোম টিউটর আছে, অনেকের বাবা, মা, ভাই বা বোন সরাসরি শিশুর পড়ালেখার যত্ন নিচ্ছেন। এই সংখ্যাও তেমন বেশি নয়।করোনা মহামারীর এই সময়ে ধীরে ধীরে শিক্ষা ব্যাবস্থায় যে ফারাক তৈরি হচ্ছে তা দিন দিন প্রকট আকার ধারণ করছে। ফলে যারা পড়ালেখার সাথে যুক্ত তারা এগিয়ে যাবে নিঃসন্দেহে। তারা পৌঁছে যাবে তাদের অভীষ্ট লক্ষ্যে। পিছিয়ে পড়বে খেটে খাওয়া, শ্রমিক, দিনমজুর, রিক্সা চালক, বস্তিতে বসবাসকারী নিম্নবিত্তের সন্তানেরা। করোনা পরবর্তী সময়ে তাদের থাকবেনা আর্থিক সামর্থ্য, এর ফল সরূপ–
** নিম্ন আয়ের পরিবার গুলো অনেক শিশুকে জোর করে অর্থ উপার্জনে নামিয়ে দেবে।
** তাদের অনেকেই হয়তো আর স্কুলে ফেরার সুযোগ পাবেনা।
** একটি প্রজন্ম হারাবে তাদের উজ্জ্বর ভবিষৌত।
** বিভিন্ন দিক দিয়ে পিছিয়ে পড়া কোন শিক্ষার্থী যদি বিদ্যালয়ে ফিরেও আসে তার মধ্যে একটা ডিপ্রেশন কাজ করবে।
** আবার দীর্ঘদিন বাড়িতে বন্দী থাকায় শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশগত সমস্যা দেখা দিতে পারে।
** বেড়ে যেতে পারে শিশু শ্রম।
** অসময়ে বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়ার হার বেড়ে যেতে পারে।
** দূরন্তপনা থেকে দুরে থাকা, বন্ধুদের সাথে মেলামেশা করতে না পারায় মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে যেতে পারে।
** বাল্য বিবাহের মতো সামাজিক ব্যাধি বেড়ে যেতে পারে।
** টিকাদান কর্মসূচী বন্ধ থাকায় হাম, ডিপথেরিয়া, যক্ষ্মা, পোলিও র মতো রোগ নতুন জন্ম নেওয়া শিশুদের আক্রান্ত করতে পারে।

শিক্ষার্থী ঝরেপড়া যদি রোধ করা না যায়, অসহায় পরিবারগুলোকে যদি পূণর্বাসনে সহায়তা করতে না পারি তাহলে সমাজে নেমে আসবে বিশৃঙ্খলা, বেড়ে যাবে চুরি-ডাকাতি যা সমাজকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেবে। তাই বাঁচাতে হবে দেশ, সমাজ পরিবারকে। নিজ নিজ অবস্থান থেকে এগিয়ে আসতে হবে।তাদের উঠে দাঁড়ানোর জন্য যতটুকু পারি সাহায়্যের হাত বাড়িয়ে দিতে হবে। তবেই আমরা মুক্তভাবে নিঃশ্বাস নিতে পারব, প্রকুতির নির্মল বাতাসে অবগাহন করতে পারবো। দেশ ফিরে পাবে আগের চেহারাহয়তো সব প্রতিকূলতা ভেদ করে উঠে দাঁড়াব একদিন। নতুন করে আবার পথ চলা শুরু হবে। পরিবর্তন আসবে বিশ্ব ব্যাবস্থায়। শিক্ষা ব্যাবস্থা ফিরবে তার নিজস্ব কক্ষ পথে। কিন্তু একটি প্রজন্ম যা হারিয়েছে তা তো ফিরে পাবেনা। তাদের জীবন থেকে চলে গেছে বিশাল একটি “সময়'”। হারিয়েছি অনেক আত্মীয়, স্বজন, বন্ধু, প্রতিবেশি। দেশ হারিয়েছে তার সোনার ছেলেদের। যে ক্ষতি কখনো পূরণ হবার নয়। চাইলে যা আর ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। তবুও নতুন আশায় বুক বাঁধি, চলি হাতে হাত ধরে। ঘরে থাকি, সুস্থ থাকি।

লেখক-
আবদুল মালেক
সহকারি শিক্ষক,
উখিয়া মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর